ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ২০ জৈষ্ঠ্য ১৪২৯, ১২ রজব ১৪৪৪

প্লাস্টিক পণ্যে নীরব বিপ্লব



প্লাস্টিক পণ্যে নীরব বিপ্লব

দেশে প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদনে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। প্ল্যান্ট বসেছে, উৎপাদনও শুরু হয়েছে। বিদেশেও রপ্তানি শুরু হয়েছে এ পণ্যের। তবে এ পণ্যের কাঁচামাল ছিল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। এতে উৎপাদন কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হতো।

এখন থেকে দেশেই তৈরি হবে প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল। প্লাস্টিকপণ্যের এ কাঁচামাল দেশেই তৈরি করতে বড় বিনিয়োগ করছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। চালুর মাত্র তিন মাসে ১৫০ কোটি টাকার রপ্তানি করে আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক কাঁচামালের বাজারে প্রবেশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৭০০ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্ল্যান্ট বসেছে, উৎপাদনও শুরু হয়েছে। উৎপাদিত রেজিন দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি শুরু হয়েছে। এ কারখানায় বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পে বড় অংকের ঋণসুবিধা দিয়েছে নেদারল্যান্ডসের আইএনজি ব্যাংক।

বিজনেস ওয়্যার প্রকাশিত বাংলাদেশ প্লাস্টিক মার্কেট আউটলুক ২০১৯-২০২৫ অনুসারে, কম খরচে উত্পাদন, টেকসইতা, কাঁচামালের প্রাপ্যতা এবং স্থায়িত্বের কারণে বাংলাদেশের প্লাস্টিকের বাজার বার্ষিক ৮ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে (সিএজিআর) পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ বছরে ৭ কেজি, ভারতে প্রায় ২৩ কেজি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের মতো অন্যান্য উন্নত দেশে বছরে এই পরিমাণ ১০০ কেজির বেশি। তাই এই বাজারে বিশাল প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৪-২৫ সালের মধ্যেই এ বাজার সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার জন্য প্রস্তুত। 

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, প্লাস্টিকপণ্যের কাঁচামালের চাহিদা বাড়ছেই। এজন্য এ শিল্পে বিনিয়োগ করেছি। নতুন কারখানায় বছরে যে পরিমাণ কাঁচামাল তৈরি হবে, তাতে দেশীয় চাহিদার অর্ধেকের বেশি মেটানো সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, আমাদের অনেক ধরনের কাঁচামালের প্রয়োজন হয়। আমরা পিইটি রেজিন এবং পিভিসি রেজিনের জন্য আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। সর্বশেষ পিভিসি রেজিন টনপ্রতি ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ ডলার দরে কিনেছি। আন্তর্জাতিক বাজারে এই দাম প্রায়ই ওঠানামা করে। এই কাঁচামাল দেশে উৎপাদিত হলে, তা আমাদের ব্যবসাকে ব্যাপকভাবে লাভবান করবে। আমরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসব কাঁচামাল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারবো। এটি দেশের জন্য একটি নতুন দিগন্তের সূচনা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, মেঘনা গ্রুপ পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট খুলেছে; এটি প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এখানে উৎপাদিত কাঁচামাল দেশের অন্যান্য শিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

গ্রুপটির কারখানা থেকে প্লাস্টিকের মূল কাঁচামাল পিভিসি ও পেট রেজিন উৎপাদন হবে, যা আগে ছিল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে প্লাস্টিকপণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তিন লাখ ২৬ হাজার টন পিভিসি আমদানি করেছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৪৭ কোটি ডলার। আর পেট রেজিন আমদানি হয়েছে দুই লাখ ২৯ হাজার টন। এতে ব্যয় হয়েছে ২৭ কোটি ডলার।

মেঘনা গ্রুপের সিনিয়র এজিএম (ফাইন্যান্স) আফজাল হোসেন বলেন, এটা আসলে শতভাগ আমদানিনির্ভর পণ্য উৎপাদন করবে। কারখানায় আমরা পিভিসি ও পেট রেজন উৎপাদন করবো। এ দুটি আইটেম আমরা সম্পূর্ণ আমদানি করছি। কোনো ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট আগে ছিল না। এগুলো আগে আমাদের চীন থেকে আমদানি করতে হতো। আমাদের ফ্যাক্টরিতে উৎপাদনের ফলে এখন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

তিনি বলেন, পিভিসি রেজিনের বার্ষিক চাহিদা চার লাখ টনের বেশি। যেখানে আমাদের ক্যাপাসিটি দেড় লাখ টন। আমরা ৪০ শতাংশের মতো চাহিদাপূরণ করতে পারবো। এ রেজিন দিয়ে পিভিসি পাইপ, ফার্নিচার, প্লাস্টিক শিট- এ ধরনের পণ্য তৈরি করা যাবে। পেট রেজিনের ক্ষেত্রে বলা যায়, ৯০ শতাংশ চাহিদা আমরা পূরণ করতে সক্ষম হবো।

২০১৭ সালে প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদনের জন্য যে কাঁচামাল লাগে, তা তৈরিতে কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়। মহামারি করোনাভাইরাসে কারণে কারখানা স্থাপনের কাজে কিছুটা ধীরগতি ছিল। তবে চলতি বছর থেকে কারখানাটি উৎপাদনে আসে। এ কারখানায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

উদ্যোক্তারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে ২০৩০ সালে ১০ বিলিয়ন টাকার প্লাস্টিক পণ্যসামগ্রী রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন। সেক্ষেত্রে মেঘনা গ্রুপের এ কারখানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।


   আরও সংবাদ