ঢাকা, সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ৯ আশ্বিন ১৪২৯, ২১ শাওয়াল ১৪৪৩

কোথাও মিলছে না পুরনো সয়াবিন তেল

নতুন তেলে কাটছে সংকট

কোথাও মিলছে না পুরনো সয়াবিন তেল

স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে সয়াবিন তেলের বাজার। বাজারের প্রতিটি দোকানেই মিলছে নতুন বোতলজাত সয়াবিন তেল। পুরনো তেল কিনতে হন্য হয়ে ঘুরছেন ক্রেতারা। প্রতিটি বাজারের দোকানে দোকানে ঘুরছেন তারা। তবে কোথাও মিলছে না পুরনো বোতলজাত তেল। সবার একটাই প্রশ্ন গুদামজাত করে রাখা এত তেল কোথায় গেল? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারওয়ান বাজারের এক দোকান পরিচালক দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, এতদিন গুদামজাত করে রাখা তেল তো সরকার অভিযান চালিয়ে জব্দ করেছে। যে কারণে বাজারে পুরনো তেলের সন্ধান মিলছে না। কারওয়ান বাজারের প্রতিটি দোকান ঘুরে দেখলেও এক লিটার পুরনো সয়াবিন তেল খুঁজে পাবেন না। তার কথার সত্যতাও মিলেছে আবদুল্লা নামেন এক ক্রেতার দেয়া তথ্যে। তিনি বলেন, সাইকেল নিয়ে বাজারে বাজারে ঘুরেছি কিন্তু কোথাও পুরনো বোতলজাত তেল পাইনি। এখন বেশি দামে (নতুন দাম) নতুন তেল কিনতে হয়েছে। কত টাকায় কিনলেন এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল্লাহ বলেন, ৫ লিটারের দাম নিয়েছে ৯৮০ টাকা।

কারওয়ান বাজারের আলী ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে  সারি সারি সয়াবিন তেল। প্রতিটি বোতলের গায়ে নতুন মূল্য দেয়া রয়েছে। পুষ্টি সয়াবিনের একলিটার তেলের বোতলে মূল্য দেয়া রয়েছে ১৯৮ টাকা। তবে বিক্রি করা হচ্ছে ২০০টাকা করে। এ বিষয়ে দোকান কর্মচারীর অজুহাত দুই টাকা খুচরো না থাকায় ২০০ টাকা করে বিক্রি করছেন তারা। কেউ যদি খুচরো দিতে পারে তাহলে ১৯৮ টাকা রাখা হয়। একই ৫০০ গ্রাম বোতলজাত তেল বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকায়। ৫ লিটারের ভোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ে মূল্য রয়েছে ৯৮৫ টাকা। তবে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫ টাকা কমিয়ে ৯৮০টাকায় বিক্রি করছে বেশিরভাগ দোকানী।

আরো পড়ুন: গুদামে আর কত?

বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের পরিচালক রাসেল ক্ষোভ প্রকাশ করে দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, আগে কম টাকায় বেশি তেল কিনতে পারতাম। ক্রেতাও ছিলো বেশি। এখন অধিক টাকা খরচ করে কম তেল কিনতে হচ্ছে। আগের মতো ক্রেতাও নেই। এখন বেশি পুঁজি খাটিয়ে কম লাভ করতে হচ্ছে। তবে এতদিন তেলের সঙ্কট থাকলেও এখন আর নেই। কোম্পানীগুলো থেকে এখন তেল পাওয়া যাচ্ছে। দাম বেশি হওয়ার কারণে ক্রেতার সংখ্যা অনেকটা কমে গেছে বলে জানান তিনি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। আগে টন প্রতি ৭৫০ ডলার করে খরচ পড়লেও এখন ১৯০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঈদের আগে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলো ব্যবসায়ীরা। মানুষের ব্যয়ের কথা চিন্তা করে তখন দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সরকার অনুমোদন করেনি। যদিও আগেই বেশি দামে বিশ্ব বাজার থেকে তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ঈদের পরে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে এক সাথে এতটাকা বৃদ্ধিতে ভোক্তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে জানিয়ে ব্যাবসায়ী নেতারা বলছেন, এর দায় সম্পূর্নভাবে সরকারকে নিতে হবে।

আরো পড়ুন: ‘তেল কাণ্ডের দায় সরকারের’

ভোজ্যতেল সংকটেরর বিষয়ে এস আলম গ্রুপের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের সরবরাহ ঠিক আছে। সাধারণত প্রতিদিন ৩-৪ হাজার টন সরবরাহ থাকে। রমজানে এটি বেড়ে ৪-৫ হাজার টন হয়। আমরা নিয়মিত সরবরাহ করেছি। সরকারের কাছে সরবরাহের তথ্য আছে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও আমরা রমজানে দাম স্বাভাবিক রেখেছি। কিন্তু শেষের দিকে কি হয়ে গেল আমরা কেউ জানি না। তবে সবাই যখন বুঝতে পারছিল কয়েকদিন পরে দাম বাড়বে। তখন কেউ কেউ মজুত করেছে। টিকে গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের উচিত চাহিদার ২০ শতাংশ তেল আমদানি করা। এছাড়া টিসিবির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের চাহিদার অনুযায়ী তেল আমদানি করা দরকার। এছাড়া এ বিষয়ে সঠিক গাইডলাইন দরকার। কতটুকু মজুত করতে পারবে তা নির্ধারণ করে দিতে হবে। 

বাজার স্বাভাবিক হলেও পুরনো তেলের দেখা মিলছে না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে দোকান আছে ৫৪ লাখের মতো। সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি দোকান থেকে তেল উদ্ধার করেছে সরকার। যেসব দোকান থেকে তেল উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো জব্দ করা হয়েছে। হয়তো এখনো কিছু দোকানে মজুত থাকতে পারে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার অপেক্ষায় ছিলো। দাম বাড়ার পর তারা সুযোগ খুঁজতে লুজ করে বেচার জন্য। যদিও খুব একটা তেল মজুত আছে বলে মনে হচ্ছে না।

বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে টিসিবির উচিৎ ভোজ্যতেল আমদানি করা উচিত জানিয়ে জসিম উদ্দিন বলেন, টিসিবি স্বল্পমূল্যে বিক্রির জন্য ২ কোটি লিটার তেল নিয়েছে আমদানিকারকদের কাছ থেকে। সংকটের পিছনে সেটিও কাজ করেছে। সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেই সরকারের। এতে করে নতুন নতুন সমস্যা হচ্ছে। ১৫ দিন পরপর বাজার সমন্বয় করা উচিত। এছাড়া বন্ডের মাধ্যমে তেল আমদানি করতে হবে। তাহলে সরকারের কাছে তথ্য থাকবে। তিনি বলেন, লুজ তেল বিক্রি বন্ধ করলে দাম ২০ শতাংশ কমানো সম্ভব। ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক হলে সমস্যা সমাধান সম্ভব। এছাড়া সরকারের উচিৎ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে সমস্যা সমাধান করা।

এদিকে আগামী সোমবার থেকে ট্রাকে করে ভোক্তাদের জন্য ১১০ টাকা করে সয়াবিন তেল বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এখান থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ২ লিটার সয়াবিন তেল কিনতে পারবেন।


   আরও সংবাদ