ঢাকা, রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ চৈত্র ১৪২৯, ১০ জ্বমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

রিজার্ভে চাপ বাড়ছে



রিজার্ভে চাপ বাড়ছে

দেশে ডলার সংকট চরমে। চাহিদা মতো ডলার পাচ্ছে না আমদানীকারকরা। চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে হুহু করে কমতে শুরু করেছে বৈদেশিক মুদ্রা। সংকটে পড়েছে রিজার্ভ। কমতে কমতে নেমেছে ৩৬ বিলিয়নের ঘরে। যা গত ২৬ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। বিশ্লেষকরা বলছেন, যে পরিমান রিজার্ভের কথা বলা হচ্ছে তা পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য নয়। এর মধ্য থেকে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ঋণসহ বিভিন্ন তহবিলে দেওয়া ৮ বিলিয়ন বাদ দিতে হবে। অর্থাৎ তাদের মতে দেশে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। তবে চলতি মাসের ১৪ তারিখে অর্থমন্ত্রী দেশের মানুষকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, রিজার্ভ শিগগিরই আবার ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

চলতি মাসের ১৪ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, দেশে রফতানি বেড়েছে। প্রবাসী আয়ও বেড়েছে। সম্প্রতি এক বছরে সর্বোচ্চ ২৪ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। অর্থাৎ মাসে ২ বিলিয়ন ডলার করে এসেছিল। এখন আবার প্রবাসী আয় প্রতিমাসে গড়ে ২ বিলিয়ন করে আসতে শুরু করেছে। ফলে আগে যেভাবে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, সেটি আবার হবে। তবে মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সপ্তাহ না যেতেই দেখা গেছে উল্টো চিত্র। রিজার্ভ বাড়ার বদলে কমছে আসঙ্কাজনকভাবে।

গত বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করে। এতে ডলারের পরিমান দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৯৭ বিলিয়নে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর আগের দিন মঙ্গলবার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৭ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিনিয়তই সরকারি বিভিন্ন নিত্যপণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। এর খরচ মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। যদিও দেশে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বেড়েছে। তবে আমদানির ব্যয়ের তুলনায় এখনও কম। এতে রিজার্ভ কমতির দিকে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবীদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর আনু মোহাম্মদ বলেন, রিজার্ভ বাড়াতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া দরকার সরকার কার্যত তার কিছুই নেয়নি। এখনো দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। আমদানীর নামে বিদেশে প্রচুর টাকা যাচ্ছে। সেগুলো বন্ধ করতে পারেনি। একদিকে বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাচ্ছে অন্যদিকে দেশের টাকা চুরি করে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। সরকার আমদানী কমানোর কথা বললেও বিদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে ইভিএম কেনার চেষ্টা করছে। এমন অপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থ খরচ করলে রিজার্ভ আরো বেশি সংকটে পড়বে। এসব খাতে খরচ কমানো গেলে কিছুটা স্বস্থি ফিরতে পারে বলে জানান এই অর্থনীতিবীদ।

গত ৮ সেপ্টেম্বর এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জুলাই-আগস্ট মেয়াদের ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আমদানির বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৩৭ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২৬ মাস (দুই বছর দুই মাস) পর রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নামে। এর আগে ২০২০ সালের ২৯ জুলাই রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে ৩৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। এরপর গত কয়েক দিন তা ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ওপরেই অবস্থান করছিল।

গত বুধবার কয়েকটি ব্যাংকের কাছে সরকারি কেনাকাটার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি ব্যাংকের কাছে ৭ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের দুই মাস ২১ দিনে (১ জুলাই থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) রিজার্ভ থেকে ২৮০ কোটি (২.৮০ বিলিয়ন) ডলারের মতো বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রাবাজার স্বাভাবিক রাখতে ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে ৭৬৭ কোটি (৭.৬৭ বিলিয়ন) ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই রিজার্ভ থেকে এক অর্থবছরে এত ডলার বিক্রি করা হয়নি। তার আগের অর্থবছরে (২০২০-২১) বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় দর ধরে রাখতে রেকর্ড প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত ১২ জুলাই আকু মে-জুন মেয়াদের ১ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। এরপর ২০ জুলাই পর্যন্ত রিজার্ভ ৩৯ দশমিক ৮০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। জুলাইয়ের শেষে তা কমে ৩৯ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে ডলারের ঘাটতি থাকায় রিজার্ভ থেকে জোগান দেওয়া হচ্ছে। ফলে রিজার্ভ কমে আসছে। বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে আমদানি কমছে। তবে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়ছে। ফলে ডলারের চাহিদাও কিছুটা কমছে। সামনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবীদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমাটা স্বাভাবিক। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বাড়াতে হলে রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ করতেই হবে। সংকট উভয় দিকে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, চাহিদা মেটাতে গেলে রিজার্ভ কমবে, আর রিজার্ভ ধরে রাখতে গেলে চাহিদা মেটানো যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিৎ চাহিদা কমিয়ে আনা। সর্বপ্রথম সরকারি চাহিদা কমিয়ে আমদানী কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত বেসরকারিভাবে আমদানী ব্যয় কমাতে হবে। যা আসলে কমাতে দেখা যাচ্ছে না। চাহিদা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকার মধ্যে। এ দামে চাহিদা কমানো যাবে না। চাহিদা কমাতে হলে ডলারের দাম নিয়ে যেতে হবে মিনিমাম ১১০ টাকায়। তাহলেই চাহিদা কিছুটা কমে আসবে। আর চাহিদা কমলেই রিজার্ভ স্থিতিশীল থাকবে।


   আরও সংবাদ