ঢাকা, রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ চৈত্র ১৪২৯, ১০ জ্বমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সাফজয়ীদের বেদনার গল্প



সাফজয়ীদের বেদনার গল্প

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি জয়ে ইতিহাস তৈরি করেছে বাঘিনীরা। হিমালয় কন্যাদের পরাস্ত করে ট্রপি করে নিয়েছেন নিজেদের। এর মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় লেখা হলো নতুন এক গল্প। যে গল্প গর্বের আর আনন্দ-উচ্ছাসের। যে আনন্দে মেতেছে পুরো বাংলাদেশ। তবে এর পেছনেই তৈরি হয়েছে নতুন আরেক গল্পের। যা লজ্জা, হাতাশা আর কষ্টের। এমন গল্পে হতবাক উচ্ছসিত ঘোটা দেশ। 

গল্পের শুরুটা হয়েছিলো দেশে ফেরার পরে। শোভাযাত্রা থেকে নারী ফুটবল দলের স্ট্রাইকার কৃষ্ণা রানি সরকারের ব্যাগ থেকে চুরি হয়ে যায় টাকা। দশ-বিশ কিংবা পঞ্চাশ হাজার নয় চুরি যায় আড়াই লাখ টাকা। এছাড়া প্লেয়ারদের ত্রটিহীন একাধিক ব্যাগ বিমানবন্দর থেকে বের হয় তালা ভাঙা অবস্থায়। যদিও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে তারা সবগুলো ব্যাগই ঠিকঠাক তুলে দিয়েছে খেলোয়ারদের হাতে। 

জানা গেছে, ঢাকা বিমানবন্দর থেকে প্লেয়ারদের নিয়ে শোভাযাত্রা বের হয়। লাগেজ বেল্টের একপাশে পড়ে ছিল সাবিনা, কৃষ্ণাদের লাগেজগুলো। পরে বাফুফের পক্ষ থেকে লাগেজগুলো সংগ্রহ করা হয়। এবিষয়ে কৃষ্ণা বলেছিলেন, যেহেতু দেশের আসার পর আমাদের জন্য বড় ধরনের আয়োজন ছিল। এ জন্য আমরা আমদের হ্যান্ডব্যাগটাও লাগেজের ভেতরে রেখেছিলাম। পরে যখন লাগেজ খুলি, তখন দেখি ভেতরের ছোট ব্যাগের চেন খোলা। ব্যাগের ভেতরে আমার ৯০০ ডলার, শামসুন্নাহার সিনিয়রের ৪০০ ডলারসহ আরও অনেকের কিছু ডলার ছিল। বাংলাদেশি টাকায় যার মূল্য আড়াই লাখ টাকার মতো। সেগুলোর কিছুই নেই ব্যাগের ভেতর।

এমন ঘটনার রেস কাটতে না কাটতেই আসে আরেক খবর। ভেঙে ফেলার খবর আসে মাসুরা পারভীনের ঘর। সওজ কর্তৃপক্ষ লাল ক্রস চিহ্ন লাগিয়ে দেয় সাতক্ষীরার এই ফুটবলারের বাড়িতে। এই নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দিনভর সমালোচনা চলতে থাকে দেশজুড়ে। পরে অবশ্য ক্রস চিহ্ন মুছে ফেলা হয়। তার বাড়িটি আর উচ্ছেদ করা হবে না বলে জানানো হয় সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের পক্ষ থেকে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সওজ কর্তৃপক্ষের দেওয়া এই লাল ক্রস চিহ্ন মুছে ফেলা হয়। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় ১৩নং লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো আব্দুল আলিম এটি মুছে দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মো. হুমায়ুন কবির  বলেন, যতদিন না পর্যন্ত মাসুরার পরিবার নিজেদের বাড়ি বাংলাদেশ সড়ক বিভাগের নির্ধারিত জায়গা থেকে সরিয়ে নতুন বাড়ি করবেন ততদিন পর্যন্ত তাদের (সওজ) কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ করা গেলো।

গল্পে নতুন মাত্র যোগ করে নারী দলের অন্যতম ফুটবলার আঁখি খাতুনের গল্প। এদিন সন্ধ্যায় আদালতের নথি নিয়ে পুলিশ উপস্থিত হয় আঁখি খাতুনের সিরাজগঞ্জের বাড়িতে।

এ বিষয়ে ডিফেন্ডার আঁখি বলেন, বুধবার সন্ধ্যায় শাহজাদপুর থানা থেকে এসআই মামুন আমাদের বাড়িতে এসে আমার বাবাকে আদালতের একটি কাগজে সই করতে বলেন। আমার বাবা সেই কাগজে সই করেননি। তাই আমার বাবাকে এসআই মামুন থানায় নিয়ে যাবে বলে হুমকি দেয় এবং গালাগাল করে। পরে বাবা আমাকে ফোনে বিষয়টি জানান। এসআই নাকি বলেছে, আমি বাড়ি যাওয়ার পর থানায় যেতে হবে আমাকে। আসলে গতকাল এমন এক আনন্দঘন মুহূর্তে এমন সংবাদে আমার মনটা অনেক খারাপ হয়ে যায়।

আঁখির বাবা আক্তার হোসেন বলেন, সন্ধ্যায় থানা থেকে এসআই মামুন সাহেব এসে আমাকে একটা কাগজ দিয়ে বলে, ‘আঁখি তো বাড়িতে নেই। তার পরিবর্তে আপনি এই কাগজে সই দেন। আমি বলি কেন সই দেব? আমি তো বাদী বা আসামি কোনোটাই না। তখন আমাকে কটূক্তি করেছে, আর এক পুলিশ সদস্য আমাকে ধরে নিয়ে যাবে বলেছে। আসলে এই জায়গা তো আমাদের সরকার দিয়েছে। কোনো মামলা বা অভিযোগ হলে সরকারের নামে হবে। আমাদের নামে কেন আদালত সমন পাঠাবে?

শাহজাদপুর থানার এসআই মোহাম্মদ মামুন বৃহস্পতিবার বলেন, আসলে যে ঘটনাটা আপনারা বলছেন, তা সত্য না। আঁখির নামে শাহজাদপুরের দাবারিয়ায় একটি জায়গা আছে। সেই জায়গা নিয়ে মোকাররম হোসেন নামের এক ব্যক্তি সিরাজগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে অভিযোগ করে। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত শান্তির লক্ষ্যে ১৪৪ ধারা জারি করে একটি নোটিশ প্রেরণ করে। আমি বিজ্ঞ আদালতের সেই কাগজটিতে একটি স্বাক্ষর দিতে বলি, কিন্তু আঁখির বাবা সেই স্বাক্ষর দিতে রাজি না হলে আমি থানায় চলে আসি। আমি তাকে কোনো প্রকার হুমকি-ধমকি দিইনি বা থানায়ও নিয়ে আসতে চাইনি।

তবে গল্পের শেষে আসে কিছুটা আনন্দের খবর। চুরি হওয়া টাকা উদ্ধারের জন্য এরই মধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। যদি শেষ পর্যন্ত টাকা উদ্ধার করা সম্ভব না হয় তাহলে কৃষ্ণা রানী সরকার ও শামুসন্নাহারকে নিজেদের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করবে বাফুফে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাফুফের নারী ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, বিষয়টি আমরা প্রত্যাশা করিনি। শুধু দুজন ফুটবলারের চুরি হয়েছে। কৃষ্ণা রানী সরকারের ৯০০ ডলার আর শামছুন্নাহারের ৪০০ ডলার। মোট ১৩০০ ডলার চুরি হয়েছে। আর কোনো কিছু চুরি হয়নি। আমরা এরই মধ্যে অফিশিয়ালভাবে বিমানবন্দরে অভিযোগ জানিয়েছি। চিঠি না দিলে তো তারা কাজ শুরু করবে না। অভিযোগের আগে ওভার ফোনেও জানিয়েছি। এরপর অফিশিয়াল ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এরপর ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার কার্যনির্বাহী কমিটির এই সদস্য যোগ করেন, ওরা বাচ্চা মেয়ে। ওদের কাছে এটা অনেক বেশি টাকা। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। আর যদি এই টাকা না পাওয়া যায় তাহলে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) সেটা দেখবে। ফুটবল ফেডারশনের পক্ষ থেকে আমরা ওদের টাকাটা দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নেব।


   আরও সংবাদ