ঢাকা, রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ চৈত্র ১৪২৯, ১০ জ্বমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪
মুন্সীগঞ্জে পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষ

‘ওরা আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলল’



‘ওরা আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলল’

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ যুবদল কর্মী শাওন ভূঁইয়া বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। শুক্রবার সকালে নিহতের বাড়ি মিরকাদিমের মুরমা এলাকায় গিয়ে এমন চিত্রই দেখা যায়। শোকে স্তব্ধ ছিলো পুরো এলাকা।

শাওন ভূঁইয়া (২২) সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার মুরমা এলাকার ছোয়াব আলীর ছেলে। চালাতেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। চার ভাই, এক বোনের মধ্যে ছিলেন সবার বড়। ছিলেন মিরকাদিম পৌরসভা ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের কর্মী।

শুক্রবার সকালে মিরকাদিমের মুরমা এলাকায় প্রবেশ করতে দেখা গেলো সমগ্র এলাকা শোকে স্তব্ধ। শাওনের বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখা যায় দুটি ভাঙ্গা টিনের ঘর। টিনের ঘরের একটি কক্ষে চুপটি মেরে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে নিহত শাওনের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার। পাশের ছাপড়া ঘরে স্তব্ধ ঢুকরে কাঁদছিল শাওনের মা লিপি আক্তার। প্রতিবেশীরা এসে তাদেরকে বিভিন্নভাবে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। স্বামী হারানো সাদিয়া, ছেলেহারা মা লিপি আক্তার কারো শান্তনা তে থামছে না। 

স্থানীয়রা বলেন, শাওন অভাব-অনটনের মধ্যে  বড় হয়েছে। বিএনপিকে সে ছোটবেলা থেকে ভালোবাসতো। এজন্য দলটির কোনো সভা হলে সেখানে যেতে। বুধবারও শাওন বিএনপি'র বিক্ষোভ সমাবেশে গিয়েছিলো।সেখানে তাকে পুলিশ নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করল। ২০২১ সালে শাওন ভূইয়াকে ভালোবেসে বিয়ে করেন সাদিয়া আক্তার। ৮ মাস আগে তাদের  ঘর আলো করে এসেছিল ছেলে সাহাদ ভূইয়া।অভাব অনটনের সংসারে যখন যে কাজ পেতেন, সেটা দিয়েই সংসার চালাতেন তিনি।স্ত্রী বাচ্চার ভরণ পোষণ করতেন। বাবা-মার সংসারেও ভরন পোষণ  দিতেন। 

সাদিয়া আক্তার বলেন, আমা‌দেরকে ব‌লেন, বিয়ের পরে শশুর বাড়ি, পাইক পাড়া বাবার বাড়ি দু'জায়গায় থাকতাম। ছেলে হওয়ার পর থেকেই বাবার বাড়িতে ছিলাম।গত সোমবার শাওন আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল। সেদিন আসার সময় আমাকে বলেছিল, দু-একদিন পরে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যাবে। এজন্য সে বাজার-সদাই করবে। তাই এ কদিন সে খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করবে। 

সাদিয়া কান্নায় ভেঙে পরে বলেন, শাওন আমাকে ও ছেলেকে বাড়ি নিয়ে এলো না। আমরা নিজেরাই এলাম। শাওন তো আর এলোনা। আমি শাওন  হত্যার বিচার চাই।  

শাওনের মা আরো বলেন, চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে শাওন সবার বড় ছিল। আমার ছেলেটা অল্প বয়সে বিয়ে করল। আমাদের সংসারের হাল ধরল। বুধবার বাড়ি থেকে যাওয়ার আগে বলেছিল ঘুরতে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসবে। আমার ছেলে আর ফিরে এলো না। আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেললো। আমার ৮ মাস বয়সি নাতি সাহাদ বাবাকে চেনার  আগেই হারালো।আমাদের অভাব-অনটনের সংসার। ছোট্ট শিশুটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মধ্যে পড়ে গেল। 

ছোট ভাই সোহান ভূঁইয়া জানান, শাওন বাবার সঙ্গে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। বুধবার বিএনপির সমাবেশে এসেছিলেন। পরে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে মাথায় গুলি করে। এতে তার ভাই তখনই জ্ঞান হারান। তাকে উদ্ধার করে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছাত্রলীগ এবং পুলিশের লোকজন তার ভাইকে চিকিৎসা করাতে দেননি। তারা শাওনকে ঢাকায় নিয়ে আসতে চাইলেও সেখানেও তাদের আটকে দেন। পরে বুধবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে শাওনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। এরপর থেকে তার ভাই লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। বৃহস্পতিবার রাত নয়টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং দলীয় নেতা-কর্মী হত্যার প্রতিবাদে মুন্সিগঞ্জ শহরের অদূরে মুক্তারপুরে বুধবার বেলা তিনটার দিকে বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করে জেলা বিএনপি। সেখানে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের মধ্যে গুলিতে শাওন ভূঁইয়া ও বিএনপির সমর্থক জাহাঙ্গীর মাদবর (৩৮) গুরুতর আহত হন।

বুধবারের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও দলীয় নেতা-কর্মীরা জানান, বেলা তিনটার দিকে পূর্বনির্ধারিত সমাবেশে যোগ দিতে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা বিএনপির নেতা-কর্মীরা মুক্তারপুর মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। পুলিশ তাঁদের সেখানে জড়ো হতে নিষেধ করলে তাঁরা মুক্তারপুর থেকে ট্রাকে পুরোনো ফেরিঘাট এলাকায় যান। সেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা আসতে শুরু করেন। তখন সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম একটি মিছিলের ব্যানার ধরে টান দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ওই ঘটনায় পুলিশ ও সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৭০ জন আহত হয়। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মী ৫০ থেকে ৬০ জন, ৩ জন সংবাদকর্মী এবং ১৫ থেকে ২০ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।

মোঃ‌লিটন মাহমুদ/দেশখবর


   আরও সংবাদ