ঢাকা, রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ চৈত্র ১৪২৯, ১০ জ্বমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা



বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

পাইকারি পর্যায়ে বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। গতকাল সোমবার দুপুরে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। জানানো হয় সরকারের ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বিবেচনায় দাম বাড়ানো হয়েছে গড়ে ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। এতে করে ৫ টাকা ১৭ পয়সার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ২০ পয়সা। যা কার্যকর হবে ডিসেম্বর থেকে। এতে শিগগিরই গ্রাহক পর্যায়ে বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ-সংকটে পড়েছে। সংকট কাটাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ নিচ্ছে সরকার। এর বাইরে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) কাছ থেকেও আর্থিক সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। এসব সংস্থার দেয়া ভর্তুকি কমানোর পরামর্শেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে আরেক দফা বাড়বে জিনিসপত্রের দাম। এতে আরো অসহনীয় হয়ে উঠবে জনজীবন।

তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি গ্রাহক পর্যায়ে কোনো প্রভাব ফেলবে না। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়বে কি না তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) যাচাই-বাছাই করে দেখবে।

এর আগে তীব্র জ্বালানিসংকট দেখা দেয় দেশে। যে কারণে গত জুনে গ্যাসের দাম ও আগস্টে বাড়ানো হয়েছিলো জ্বালানি তেলের দাম। এতেও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এরপর গত জুলাই মাসে সারা দেশে লোডশেডিং শুরু করে সরকার। এতে বাজারে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যায় বেড়ে যায়। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংকেত নিয়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো বলে জানা গেছে।

দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম শামসুল আলম বলেন, এর আগে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব উঠেছিলো। কিন্তিু পিডিবি যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে না পারায় দাম বাড়ায়নি বিইআরসি। এখন পিডিবি যে ব্যাখ্যা দিয়েছে; তা নিয়ে ক্যাব ও অন্য পক্ষের বক্তব্য নিতে হবে। তাই পুনরায় শুনানি ছাড়া দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। এখন শীত পড়তে শুরু করেছে। জনগণের বিদ্যুতের চাহিদা কম। তাই লোডশেডিং হচ্ছে না আগের মতো। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকার দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটা ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

দাম বাড়ানোর বিষয়ে কথা হয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদের সাথে। আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ভর্তুকির কথা। তারা ভর্তুকি তুলে দিতে চায়। আইএমএফও বলেছে ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে। বিদ্যুৎখাতের বড় ভর্তুকি যাচ্ছে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার কারণে। যে কেন্দ্রগুলোর দরকার ছিল না, যেগুলোর সময় বাড়ানোর দরকার ছিল না, যেগুলো উৎপাদন করেনি, তাদেরকেও টাকা দিতে হয়েছে। ১১ বছরে এর জন্য দিতে হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি না, কিন্তু  বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো মুনাফা করছে। জনগণের টাকা থেকে তাদের দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পুরো বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা মানুষকে বিদ্যুৎ না দিয়ে একটি গোষ্ঠীকে টাকা দেওয়ার জন্য। যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে জনগণকে। এতে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বাড়বে।

গণশুনানির বিষয়ে এ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, বিইআরসির গণশুনানি লোক দেখানো ছাড়া আর কিছুই না। এটি একটি প্রহসন। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই দেখা যায়, গণশুনানিতে যেসব তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয় এবং তারপরে যে লজিক্যাল কনক্লিউশন আসে, সেগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো সম্পর্ক থাকে না। কারণ সরকার সিদ্ধান্তটা আগে নেয়। তারপর সেটাকে রেশনালাইজ (যৌক্তিক করে তোলা) করার চেষ্টা করে।

এদিকে বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধিকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হয় এটা গ্রহণযোগ্য বৃদ্ধি। কারণ শুনানির সময় বিদ্যুতের দাম ৬০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু, এখন তারা ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে। সুতরাং আমি মনে করে এটা গ্রহণযোগ্য বৃদ্ধি। তবে, বিদ্যুতের দাম দীর্ঘমেয়াদে কমাতে হবে। সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ যেন বেশি থাকে, সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্য তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সরিয়ে দিতে হবে। তারা বলেছিল এগুলো থাকবে না। কিন্তু, ১০ বছর হয়ে গেছে, এখনো সেগুলো আছে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রের কারণেই বিদ্যুতের দাম বাড়ে।

গ্রাহক পর্যায়ে এখনই দামবৃদ্ধি না করার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক ইজাজ বলেন, এখন পাইকারি পর্যায়ে বাড়ানো হলো। গ্রাহক পর্যায়ে বৃদ্ধিটা যদি ১ বছর পরে করা হয়, তাহলে গ্রাহকদের জন্য ভালো হবে। অন্যথায় গ্রাহকদের জন্য বোঝা হয়ে যাবে। কারণ, এখন এমনিতেই সবকিছুর দাম বেশি। এ সময়ে গ্রাহক পর্যায়ে না বাড়ানেই উচিত হবে। বাজারের যে সার্বিক অবস্থা, গ্রাহক পর্যায়ে এখন বাড়ালে ভোক্তাদের ওপর দ্বিগুণ চাপ পড়বে।

উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রক এ সংস্থার কাছে গত জানুয়ারি মাসে দাম বাড়ানোর আবেদন করেছিল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তখন সেই আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়েছিলে। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এক মাসের মাথায় আপিল করে পিডিবি। এ আবেদন বিইআরসি বিবেচনায় নিয়ে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিল। আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেবে কমিশন। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন করবে বিতরণ কোম্পানিগুলো।

গত এক যুগে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে নয়বার। এ সময় পাইকারি পর্যায়ে ১১৮ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে ৯০ শতাংশ বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। সবশেষ দাম বাড়ানো হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যা ওই বছরের মার্চ থেকে কার্যকর হয়। ওই সময় পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। একই সময়ে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।


   আরও সংবাদ