ঢাকা, সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ৯ আশ্বিন ১৪২৯, ২১ শাওয়াল ১৪৪৩

গ্যাসের চুলায় বাড়ির ক্ষতি



গ্যাসের চুলায় বাড়ির ক্ষতি

চলতি সপ্তাহে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্যাসের চুলা থেকে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান মিথেন গ্যাস নির্গত হয়। ৪ কোটি গ্যাসের চুলা থেকে নির্গত এই গ্যাস পরিবেশের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব রাখে তা পাঁচ লাখ গ্যাসচালিত গাড়ির দূষণের সমান। গবেষণাটির প্রধান গবেষক ও পিএসই হেলদি এনার্জির গবেষক এরিক লেবেল বলছেন, চুলা না ধরালেও এই গ্যাস নির্গত হয়।

"গ্যাসের চুলা থেকে যে পরিমাণ মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, এর চার ভাগের তিন ভাগ চুলা বন্ধ থাকার সময়েই নির্গত হয়। খুব কম মনে হলেও দিনশেষে এই পরিমাণ বিশাল," বলেন তিনি। তবে এই গ্যাস লিকের জন্য আবার বিস্ফোরণের আশঙ্কা থাকে না বলে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা। ঠিক এই কারণেই রান্নার কাজে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর পরিমাণ এতো বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে কার্বন নির্গমনের ১০ শতাংশই হয় রান্নার কাজে।

গ্যাসের চুলা ব্যবহার তাই শুধু জলবায়ু পরিবর্তনেই প্রভাব রাখে তা নয়, এর ক্ষতিকর দূষিত কণার কারণে শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসযন্ত্রের অন্যান্য রোগ এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন কোটি কোটি মানুষ। প্রতিবার চুলা জ্বালালেই নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়। এই গবেষণায় নতুন আরেকটি দিক উঠে এসেছে, তা হলো আগের ধারণার চেয়েও দ্রুত এই নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়।

গবেষণাটির আরেকজন গবেষক ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রব জ্যাকসন বলেন, "চুলা জ্বালানোর সাথে সাথেই নাইট্রোজেন অক্সাইড ও দূষিত কণা তৈরি হতে থাকে।" এমনকি প্রায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘরের বাতাসের দূষণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত ন্যূনতম নিরাপদ সীমা অতিক্রম করে।

২০২০ সালে রকি মাউন্টেন ইনস্টিটিউটের (আরএমআই) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে সব বাসায় গ্যাসের চুলা আছে সেখানকার বাতাসে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ৫০-৪০০ শতাংশ, কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ ৩০ গুণ এবং পিএম ২.৫ এর পরিমাণ দ্বিগুণ বেশি।

এই গবেষণাটির প্রধান গবেষক ব্র্যাডি সিলস বলেছিলেন, "সমস্যার বিষয় হলো, এই দূষণ খালি চোখে দেখা যায় না। ঘরের ভেতরের বায়ু দূষণের কোনো গাইডলাইনও নেই। একারণেই আমরা নিজেরাই এমন সব পণ্য ব্যবহার করি যা আমাদেরই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।" মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) শুধু ঘরের বাইরের বায়ু দূষণের গাইডলাইন প্রকাশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আগের চেয়ে কঠোর বায়ু দূষণ গাইডলাইন প্রকাশ করেছে। ব্র্যাডি সিলস এ বিষয়ে বলেন, "বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন যদি আমরা দেখি..নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ওই নির্ধারিত পরিমাণ ঠিক রেখেই বাড়ি বানাতে হবে বলে দেই..সে অনুযায়ী গ্যাস চুলা রেখে কোনো বাড়িই বানানো সম্ভব হবে না আমার মনে হয়।"

২০১৩ সালের একটি মেটা অ্যানালাইসিস বলছে, গ্যাসের চুলা আছে এমন বাসার শিশুদের অ্যাজমার মতো উপসর্গে ভোগার আশঙ্কা ৪২ শতাংশ বেশি, জীবনব্যাপী অ্যাজমায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ২৪ শতাংশ বেশি।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ লিসা প্যাটেল বলেন, "আমরা জানতাম যে গ্যাসের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে গ্যাসের চুলা স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। উচ্চ মাত্রার নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড শিশুদের হাঁপানির ঝুঁকিতে ফেলে। কার্বন মনোক্সাইডও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে, যা  কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। আর দীর্ঘস্থায়ীভাবে পিএম ২.৫ এর সংস্পর্শে থাকলে আয়ু কমে আসা, হাঁপানি, ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং সময়ের আগে সন্তান প্রসবের ঝুঁকি বাড়ে।" প্যাটেল জানান, হুডগুলো কিছুটা সুরক্ষা দেয়। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি জরিপ অনুসারে, মাত্র ৩৫ শতাংশ পরিবার এটি ব্যবহার করে। "বেশিরভাগ মানুষের হয় হুড নেই, বা তারা হুড ব্যবহার করে না, অথবা তাদের ফিল্টারগুলো পরিষ্কার না করতে করতে অকেজো হয়ে গেছে", বলেছিলেন তিনি।

নিম্ন-আয়ের মানুষ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় হাঁপানিতে ভোগেন বেশি, কারণ তারা উচ্চ মাত্রায় দূষিত বায়ুর এলাকায় বাস করেন। ঘরের ভেতরকার দূষণ কীভাবে অধিক ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব রাখে সে সম্পর্কে কম গবেষণা হয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন, ছোট বাড়ি এবং বড় পরিবারে ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গবেষণাটির কাজে ক্যালিফোর্নিয়ার ৫৩টি বাড়ির বাতাস পরীক্ষা করে দেখেছেন। ১৮টি আলাদা ব্র্যান্ডের চুলা, চুলার বয়স তিন বছর থেকে শুরু করে ৩০ বছর, নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন চুলা থেকেও পুরনো চুলার মতোই একই পরিমাণে মিথেন আর নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে নতুন ভবন নির্মাণের সময় নতুন গ্যাস হুক-আপ স্থাপন নিষিদ্ধ হতে চলেছে এমন সময়েই গবেষণাটি সামনে এলো। গত ডিসেম্বরে নিউইয়র্কের নতুন স্থাপনায় গ্যাসের যন্ত্রপাতি বসানো নিষিদ্ধের বিল পাস করে। ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে, স্যাক্রামেন্টো সহ কয়েক ডজন ছোট শহর ও ব্রুকলিন ম্যাসাচুসেটসে অনুরূপ নিয়ম জারি আছে।

গ্যাস শিল্প এবং রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভাগুলো এর বিরুদ্ধে নেমেছে। ফ্লোরিডা, পেনসিলভানিয়া এবং টেক্সাস সহ ২০টি অঙ্গরাজ্য আগে থেকেই এমন আইন পাস করেছে যার ফলে নতুন স্থাপনায় গ্যাসের যন্ত্রপাতি বসানো নিষিদ্ধ করা সম্ভব হবে না। এরই মধ্যে স্ট্যানফোর্ড গবেষকদের একজন, জ্যাকসন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে অনুরূপ গবেষণা চালানোর পরিকল্পনা করছেন। তিনি আশা করছেন, স্থানীয় তথ্য নতুন ভবনগুলোকে বিদ্যুতায়ন এবং পুরানোগুলোকে পুনরুদ্ধার করার জন্য রাজ্য এবং স্থানীয় সরকারের জন্য মামলা তৈরি করতে সহায়তা করবে।

গবেষণাটির প্রধান গবেষক লেবেল আশা করেন, তাদের এই গবেষণা গ্যাস 'ক্লিন এনার্জি' সম্পর্কিত এমন ভ্রান্ত ধারণা দূর করবে। গ্রাহক ও সরকারকে সত্যিকারের ক্লিন এনার্জির উৎস সন্ধানে উত্সাহিত করবে। "আমরা গ্যাস পোড়াচ্ছি এই বলে যে, এটি কয়লার চেয়ে পরিষ্কার। তবে আরও ভাল বিকল্প কিন্তু রয়েছে। আমরা এটা জানি এবং বলতে পারি, অ-জীবাশ্ম জ্বালানী জলবায়ুর জন্য ভালো। আমাদের নিরাপত্তার জন্য ভালো। আপনার স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো", তিনি বলেন।


   আরও সংবাদ