ঢাকা, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৬ মাঘ ১৪২৯, ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪
শিক্ষা নিয়ে ভাবনা

শিক্ষায় অসঙ্গতি (পর্ব-১)



শিক্ষায় অসঙ্গতি (পর্ব-১)

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি। সংগ্রহে ভালো রেজাল্টও নেই। তবে শিশুদের পড়ানোর অভ্যাসটা সেই শৈশব থেকে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব ক্লাসেই ফাস্ট ছিলাম। তখন থেকেই প্রাইভেট পড়ানো শুরু। বিন্দুবাসিনীতে ভর্তি হওয়ায় ছাত্র বেড়ে গেলো। ধীরে ধীরে পড়ানোতে নেশা হয়। এই নেশা থেকেই চাকরির প্রতি মায়া ধরেনি। প্রতিষ্ঠিত করেছি ছোট্ট একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

ভাবছেন নিজের সম্পর্কে এতো বললাম কেন? এর মানে জীবনের এতোটা সময় শিক্ষাখাতে দিয়েছি যে, শিক্ষা নিয়ে কিছুটা আলোচনা করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। শিক্ষার বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি। তবে উঠে আসে শুধু অসঙ্গতি।সম্প্রতি একজন সরকারি কর্মকর্তা তার শিশু মেয়ের পরীক্ষার খাতার ছবি এফবিতে পোস্ট করেছেন। ছবিতে দেখা গেলো সবগুলো বিষয়ে ৫০ এ ৫০। বাবার অনেক খুশির পোস্টে অভিনন্দনের কমেন্ট ঝড় উঠলো। আমি অভিনন্দন জানিয়ে তাকে খুশি করতে পারলাম না।

কমেন্টে আমি লিখলাম, সন্তানের এমন সফলতায় সব বাবা মায়েই খুশি হওয়ার কথা। আমিও খুশি হতাম। তবে বাবা হিসেবে আপনাকে আরও সচেতন হতে হবে। আগামীকাল আপনি সন্তানের স্কুলে যান। শিক্ষককে বলুন আমার ৫০ এ ৫০ লাগবে না। শুধু আমার সন্তানের নিজের নাম লেখাটা শিখিয়ে দিন। কেননা ওই বাবা লক্ষ্য করেননি শিশুটা সব বিষয়ে ৫০ এ ৫০ পেলেও নিজের নাম লেখাটি শিখতে পারেনি। সবগুলো খাতায় নাম লিখে দিয়েছে পরীক্ষায় দায়িত্বে থাকা শিক্ষক। অথচ যে শিশু ৫০ এ ৫০ পেতে পারে নিশ্চিত সে মেধাবি। কিন্ত মেধাবি শিশুটিকে যথাযথ শিক্ষা দিতে পারেনি শিশুটির শিক্ষক। বাবাও বোঝার চেষ্টা করেনি শিশুর প্রকৃত অবস্থা। শিশুটির কি শেখা প্রয়োজন বাবা ভেবে দেখেনি। সন্তানের ৫০ এ ৫০ দেখে শিক্ষিত বাবাও সন্তুষ্ট না হয়ে পারে না। এই শিশুটির খাতায় ৫০ এ ৫০ আর বাবার সন্তুষ্ট নিয়ে কথা বলাটা উদাহরণ মাত্র। 

প্রতিটি শিক্ষার্থী ঘুরছে 'এ প্লাসের' পিছনে। কি শিখছে, কি শেখার প্রয়োজন এটা বোঝার প্রয়োজন মনে করছে না। পাঠ্য বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে। গাইডের প্রতি ঝুঁকছে।  সৃজনশীলতার যুগেও সৃজনশীল প্রশ্ন খুঁজছে গাইড বইয়ে। পড়ার টেবিলে নেই। সারাদিন প্রাইভেট শিক্ষকের টেবিলে। এই যাচ্ছে, এই আসছে। আবার নতুন কারও কাছে যাচ্ছে। ভাবনা একটাই ভালো রেজাল্ট করতে হবে। এ প্লাস পোতে হবে। সমাজও শিক্ষার্থীদের গ্রেড পয়েন্ট জিজ্ঞেস করে। কি জানে, কি শিখেছে এটা যাচাই করার চেষ্টা করে না চারপাশ। এ প্লাস পেলেই খুশি। সমাজ এখনও জানে না, জীবনে এ প্লাসের প্রয়োজন নেই। জীবন চালাতে এ প্লাসের প্রয়োজন হয় না। জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। সুতরাং এ প্লাস নয়, জ্ঞানের জন্য পড়া প্রয়োজন। কর্মজীবনেও এ প্লাসের প্রয়োজন নেই। 

অধিকাংশ চাকরিতে সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতা জানতে চাওয়া হয়। এ প্লাস চাওয়া হয় না। সবাই চাকরির জন্য আবেদন করতে পারেন। এরপর ফাইট করতে হয় মেধা দিয়ে। অতএব এ প্লাস পাওয়ার এই নোংরা প্রতিযোগিতা থেকে শিশুদের ফিরিয়ে আনতে হবে। তবেই শিশুরা পাবে প্রকৃত শিক্ষা।

লেখক- রেজাউল করিম (সংবাদকর্মী)


   আরও সংবাদ