ঢাকা, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩৩, ২৬ রবিউল সানি ১৪৪৮

বিমানবন্দর ঘিরে রহস্যময় ‘ভাড়াটে ডাকাত’ চক্র: সর্বস্ব লুটে ফিরে যান ইউরোপে!



বিমানবন্দর ঘিরে রহস্যময় ‘ভাড়াটে ডাকাত’ চক্র: সর্বস্ব লুটে ফিরে যান ইউরোপে!

চোখের পলকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দেওয়া কিছু লোক এসে গাড়ি থামাল। এরপর টার্গেট করা যাত্রীর হাতে হাতকড়া পরিয়ে টানতে টানতে তুলে নিল অজানা গন্তব্যে—দৃশ্যটি কোনো অপরাধমূলক সিনেমার চিত্রনাট্য মনে হতে পারে, কিন্তু এটিই এখন হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকার নির্মম বাস্তব চিত্র।

বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কয়েকটি দুর্ধর্ষ ডাকাত চক্র এখন এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, তাদের অভিনব কৌশল আর ধুরন্ধর বুদ্ধির কাছে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ডাকাতি শেষ করেই নিমিষেই উধাও হয়ে যাওয়া এই চক্রগুলোর সদস্যরা দিনশেষে মিশে যান সাধারণ মানুষের ভিড়ে, কেউ বা আবার পাড়ি জমান বিদেশেও।

এসব চক্রের মূল হাতিয়ার হলো ভাড়াটে পেশাদার অপরাধী, যাদের একেকজনের নেপথ্য কাহিনি থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। যেমন—পাবনার চাটমোহরের মো. শহিদুল ইসলাম। এলাকায় তিনি ‘মেসার্স কৃষি ভান্ডার’-এর স্বত্বাধিকারী এক নিরীহ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও পর্দার আড়ালে তিনি এক দুর্ধর্ষ ডাকাত। ডাকাতির জন্য তার সংগ্রহে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আসল পোশাক, হাতকড়া এবং ওয়াকিটকি। বিমানবন্দর এলাকায় ভাড়ায় খাটুনির পর সেই একই পোশাকেই তিনি ফিরে যান নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। সাভার, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় তার বিরুদ্ধে একাধিক ডাকাতির মামলা থাকলেও গত ২৩ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রিয়াজের ১৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় তার নাম আসতেই থলের বেড়াল বেরিয়ে আসে। রতন চৌধুরী ওরফে ডালিম নামের এক ‘মাফিয়া’ মূলত এই চক্রকে ভাড়া করেছিল।

তালিকায় রয়েছে আরও ভয়ংকর সব নাম ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। বরিশালের জলিল মোল্লার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় রয়েছে পাঁচটি ডাকাতির মামলা। তবে সবচেয়ে রোমহর্ষক কাহিনী বাগেরহাটের বাসিন্দা সৈয়দ নাসির উদ্দিনের। দিব্যি ফ্রান্সে বসবাস করা এই ডাকাত বিমানে ভারতে নেমে সেখান থেকে চোরাই পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এ দেশে নিজের শ্যালক শামীম ও অন্যান্য ভাড়াটে গুন্ডাদের নিয়ে বড় কোনো অপারেশন চালিয়ে আবার ঠিক একই রুট ধরে ফ্রান্সে পাড়ি জমান—যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার টিকিও ছুঁতে না পারে! তবে শেষ রক্ষা হয়নি, উত্তরায় একটি স্বর্ণের দোকানে চাঞ্চল্যকর ডাকাতির ঘটনায় অবশেষে ডিবির জালে ধরা পড়তে হয় তাকে। গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, আল আমীন গ্রুপ, শাওন গ্রুপ এবং চাকরিচ্যুত কিছু পুলিশ সদস্যের গড়া ‘ডিবির সাবেক সোর্স শহীদ গ্রুপ’-এর মতো চক্রগুলো ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার চুক্তিতে এই রোমহর্ষক অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর দিয়ে আসা সোনা চোরাচালানের বড় চালান লুটের টার্গেটে তো কোটি টাকারও চুক্তি হয়!

এসব অপরাধের নিষ্ঠুর শিকার হয়েছেন কুষ্টিয়ার মো. রাশেদুল ইসলাম। ২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল ভোরের আলো ফোটার আগেই সিঙ্গাপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে নেমেছিলেন তিনি। ফ্লাইটের আগের আনুষ্ঠানিকতা সারতে একটি বাসে উঠতেই ঘটে বিপত্তি। বাসের দরজা লক করে যাত্রীবেশে থাকা ৫-৬ জন ডাকাত হঠাৎ তার ওপর চড়াও হয়; চোখ-মুখ বেঁধে বেধড়ক মারধরের পর সর্বস্ব লুটে নিয়ে তাকে ফেলে দেওয়া হয় এমইএস ফ্লাইওভারসংলগ্ন জসিমউদ্দীন গোলচত্বরে। এমন অসংখ্য রোমহর্ষক ও গা শিউরে ওঠা ঘটনার জন্ম দিয়েও অপরাধীরা চোখের পলকে হাওয়া হয়ে যায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ইলিয়াস কবির জানান, অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গেই অপরাধীরা ঢাকার বাইরে বা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক কষ্টে তাদের জালে বন্দি করা গেলেও আইনের ফাঁকফোকর বা জামিনে বেরিয়ে তারা আবারও পুরনো পেশায় ফিরে আসে।

তবে থেমে নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় অপরাধ চক্রের যেকোনো নতুন কৌশল প্রতিহত করতে গোয়েন্দা নজরদারি ও সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের নিখুঁত সব জাল ছিন্ন করে এই রুদ্ধশ্বাস অপরাধের জাল পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী এখন যৌথভাবে মাঠে নেমেছে।


   আরও সংবাদ