মধ্যপ্রাচ্যে আবারো যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালায়, তবে কেবল প্রথাগত সামরিক বা অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুই নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সেন্টার, ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রতলের ইন্টারনেট যোগাযোগ ক্যাবলেও ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হবে বলে তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসিন রেজায়ি জানান, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের সম্ভাব্য যেকোনো হামলার জবাবে তাদের যুদ্ধের কৌশল হবে সম্পূর্ণ সীমানাহীন। সংঘাত ফের শুরু হলে উপসাগরীয় সাতটি দেশের তেল স্থাপনা, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার ও এআই কেন্দ্রগুলো তাদের সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরান ও তার অর্থনৈতিক জীবনরেখায় আঘাত করা হবে অথচ শত্রুপক্ষ বা তাদের সহযোগীদের অর্থনৈতিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো নিরাপদ থাকবে—এমন সমীকরণ আর বজায় থাকবে না।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি মোহসিন রেজায়ি। ছবি: রয়টার্স
একই সুর ফুটে উঠেছে ইরানের পরমাণু ও নিরাপত্তা আলোচনার অন্যতম নীতিনির্ধারক মেহদি মোহাম্মদির বক্তব্যেও। তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নীতিগতভাবে নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নিলেও এ সংঘাতের পরিণতি সামলানো তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। মোহাম্মদি সতর্ক করে বলেন, “পরবর্তী সংঘাতকে আমরা আমাদের অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখছি। দুই বছরের মধ্যে এটি তৃতীয় যুদ্ধ হতে যাচ্ছে, তাই আমাদের কৌশল হবে সব ধরণের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমারেখা ভেঙে ফেলা। যুদ্ধ শত্রুপক্ষের ধারণার চেয়েও দীর্ঘ ও ভয়াবহ হবে।”
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই পদক্ষেপ বিশ্ব প্রযুক্তি খাত এবং এআই অবকাঠামোর জন্য এক অভূতপূর্ব হুমকি। সমুদ্রতলের সাবমেরিন ক্যাবল ও হাই-টেক ডেটা সেন্টারগুলোতে আঘাত হানলে বৈশ্বিক ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আইন বিশেষজ্ঞ রেজা নাসরি সতর্ক করেছেন, যুদ্ধ পরবর্তী ধাপে পৌঁছালে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যুৎ গ্রিড, ওয়াটার ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট ও তেল শোধনাগার ধ্বংস হয়ে যাবে। যার ফলে কোটি কোটি মানুষ বিদ্যুৎ ও পানিশূন্য হয়ে ইউরোপের দিকে শরণার্থী হিসেবে ছুটবে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি অবরুদ্ধ হবে এবং ট্রাম্প প্রশাসন এক মারাত্মক সংকটে নিপতিত হবে।
ইতিমধ্যেই সংঘাতের আঁচ পড়তে শুরু করেছে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। হরমুজ প্রণালিতে ৪টি বাণিজ্য জাহাজে আইআরজিসির (IRGC) অভিযান এবং তেলের সরবরাহ বাধার শঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি রেকর্ড ১১৩.৪ ডলারে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের তিনটি বিমানবাহী রণতরি ও মেরিন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করলেও, মধ্যপ্রাচ্যে একটি বহুমাত্রিক এবং এআই-প্রযুক্তি বিপর্যয় এড়াতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ইউরোপ ও আরব দেশগুলোর এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।