ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩৩, ১১ জ্বমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

ট্রাম্প-পুতিন বৈশ্বিক রসায়ন: ব্যবসার অফারে কেন থামছে না ইউক্রেন যুদ্ধ?



ট্রাম্প-পুতিন বৈশ্বিক রসায়ন: ব্যবসার অফারে কেন থামছে না ইউক্রেন যুদ্ধ?

ইউক্রেনে রক্তক্ষয়ী সংঘাত পঞ্চম বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন— ট্রাম্প মানসিকতার একজন ব্যবসায়ী যদি ক্রেমলিনের মসনদে থাকতেন, তবে ২৪ ঘণ্টাতেই এই যুদ্ধ থামানো সম্ভব হতো।

ট্রাম্পের চোখে এই সংঘাত বন্ধ করার একমাত্র সমাধান একটি লাভজনক ব্যবসায়িক চুক্তি। শত শত কোটি ডলারের বাণিজ্যিক লেনদেন আর মস্কোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তরুণদের প্রাণহানি বন্ধের এক অতি-সহজ রূপরেখা ভাবছেন তিনি। তবে মূল সমস্যা হলো, ক্রেমলিনের ক্ষমতায় ট্রাম্পের চুক্তিপছন্দ ব্যবসায়ী নয়, বসে আছেন সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা ভ্লাদিমির পুতিন।

সিএনএনের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের মূল ব্যর্থতা হলো তারা পুতিনের মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থনৈতিক সুবিধা বা মানবিক আবেদনের চেয়ে পুতিনের কাছে তার নিজস্ব ঘোষিত সামরিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন বহু গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি সেন্ট পিটার্সবার্গে ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফের সাথে ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘ তিন ঘণ্টাব্যাপী একটি হাই-প্রোফাইল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উইটকফ ট্রাম্প প্রশাসনের শান্তি চুক্তি ও বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। কিন্তু বৈঠক শেষে ক্রেমলিনের প্রতিনিধিরা সাফ জানিয়ে দেন— আমেরিকার দেওয়া এসব প্রস্তাবের ইউক্রেন সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে কোনো বাস্তবসম্মত বা কার্যকর মূল্য নেই।

মস্কোর অবস্থান শুরু থেকেই অনমনীয়। পূর্ব ইউক্রেনের সমগ্র দোনবাস অঞ্চলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং কিয়েভের নিরাপত্তা বলয়ে নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠা ছাড়া তারা যুদ্ধ থামাতে নারাজ। অথচ সেন্ট পিটার্সবার্গ বৈঠকের আগেই ট্রাম্প মার্কিন বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন, যার মাধ্যমে মস্কোর কোষাগারে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার প্রবেশ করে।

আমেরিকা আশা করেছিল মস্কো এতে নমনীয় হবে, কিন্তু পুতিনের কাছে এটি ওয়াশিংটনের কোনো 'সদিচ্ছা' নয়, বরং আমেরিকার ওপর তাদের সুপরিকল্পিত কৌশলের এক বিরাট বিজয় হিসেবেই দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের ব্যবসায়িক মানসিকতাকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করে মার্কিন প্রশাসনকে মূল সামরিক লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে মস্কো।

বৈঠকে পুতিন ট্রাম্পকে আরও কিছু বাণিজ্যিক সুবিধার 'টোপ' হিসেবে ডিজেল চুক্তির পাশাপাশি সার আমদানি, যৌথ জ্বালানি প্রকল্প এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণের অর্থনৈতিক সুবিধার বার্তা দেন। তবে এসব অর্থনৈতিক প্রলোভনের বিনিময়ে পুতিন যুদ্ধক্ষেত্রে একচুলও ছাড় দিতে রাজি নন।

অন্যদিকে কৌশলগত প্রচারণার অংশ হিসেবে বৈঠকের ঠিক আগে ২০২২ সাল থেকে বন্দি ৭৪ বছর বয়সী অসুস্থ মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেয় রাশিয়া। ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে পুতিনের ‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসেবে প্রচার করলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি ক্রেমলিনের একটি সুচিন্তিত মনস্তাত্ত্বিক চাল। একজন বৃদ্ধ মার্কিন বন্দিকে মুক্ত করে পুতিন বিশ্ব দরবারে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন আদায় করে নিয়েছেন, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির জন্য এক চরম রাজনৈতিক ধাক্কা।


   আরও সংবাদ